মিসবাহ সিরাজকে ‘অপহরন করে মুক্তিপণ আদায় ও পায়ের রগ কর্তন’ নিয়ে যা জানা গেলো

প্রকাশিত: ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৪

মিসবাহ সিরাজকে ‘অপহরন করে মুক্তিপণ আদায় ও পায়ের রগ কর্তন’ নিয়ে যা জানা গেলো

বাংলা সিলেট ডেস্ক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকে অপহরণ করে মুক্তিপন আদায় ও পায়ের রাগ কাটার খবর শুক্রবার রাত থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে পরিবারের সদস্যরা গোপনীয়তা বজায় রাখায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যাচ্ছিলো না।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই আত্মোগপনে ছিলেন আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতা। তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে মিসবাহ সিরাজের পরিবার এ ব্যাপারে গোপনীয়তা বজায় রাখছে।

শুক্রবার ভোরের দিকে নগরের সাগরদিঘির পাড় এলাকা থেকে মিসবাহ সিরাজকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তার আগের রাতে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে পরিবারের সদস্যরা গোপনীয়তা বজায় রাখায় এই বিষয়টি তাৎক্ষনিকভাবে জানা যায় নি। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এ ব্যাপারে ফেসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন। তখন থেকেই বিষয়টি জানাজানি হয়।

শুক্রবার রাতে এক ফেসবুক পোস্টে সিলেট সিটি করপোরেশনের অপসারিত মেয়র ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লিখেন- ‘আওয়ামীলীগের তিন বারের নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজজে হত্যার উদ্দেশ্যে ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।সিলেটের ইতিহাসে এই ঘটনা এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। পুণ্যভূমি সিলেটে কোনো রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতার উপর কোনো কালেই এমন ঘৃণ্য কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচার ইনশাআল্লাহ এই সিলেটের মাটিতে সিলেটের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই করা হবে।

তিনি লিখেন, ‘মিসবাহ ভাইকে গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত ১২ টায় সিএনজি অটোরিকশা থেকে অপহরণ করে নির্মম অত্যাচার নির্যাতন ও ছুরিকাঘাত করে পায়ের রগ কেটে রাস্তায় ফেলে রাখে সন্ত্রাসীরা। বর্তমানে উনার অবস্থা আশংকাজনক।’

মিসবাহ সিরাজের উপর হামলার ঘটনা শুনেছেন জানিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকে অপহরন, মারধর ও মুক্তিপন আদায় করা হয়েছে হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু বিস্তারিত কিছু জানি না। পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে কোন তথ্য জানানো হয়নি। তারা পুলিশকে এড়িয়ে চলছেন।

তিনি বলেন, পুলিশ এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছে। যে এলাকায় ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যাচ্ছে সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারা এর সাথে জড়িত তা খোঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি নগরের আল হারামাইন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এই প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে বর্তামানে তার অবস্থান কোথায় তা জানা নেই।

মিসবাহ সিরাজের বিরুদ্ধে ৭টি মামলা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ধান পেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

মিসবাহ সিরাজের স্বজনসহ একাধিক সূত্র জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ১২টার দিকে মিসবাহ সিরাজ সিএনজি অটোরিকশাযোগে নগরীর সুবিদবাজারের মিয়া ফাজিল চিশত এলাকায় একটি বাসায় যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ওই এলাকার মাসালাবাজার নামীয় প্রতিষ্ঠানের সামনে পৌঁছামাত্র কয়েকটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তার অটোরিকশার গতিরোধ করে। অস্ত্রেরমুখে তাকে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর মিসবাহ সিরাজের মোবাইল ফোন থেকে তার স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে অপহরণকারীরা। তারা কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ নিয়ে দর কষাকষির পর ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয় । রাত সাড়ে ৩টার দিকে মুক্তিপণের টাকা মধ্যস্ততাকারীর হাতে তুলে দেওয়ার পর মিসবাহ সিরাজকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় সাগরদিঘীর পাড় এলাকায়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে রাগীব বাবেয়া হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নগরীর সোবহানীঘাটস্থ আল হারামাইন হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনেরা। ভোররাত ৪টার দিকে ওই হাসপাতালে তার পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়।

শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে তিনি ওই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। এরপর এভারগ্রীনের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ব্যাপারে আল হারামাইন হাসপাতালের পরিচালক ডা. চৌধুরী নাহিয়ান বলেন, ‘ভোররাত ৪টার দিকে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এরপর তার পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। যদিও স্বজনেরা বলেছেন তিনি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন।’

ডা. চৌধুরী নাহিয়ান আরো বলেন, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের বাম পায়ে হাটুর নীচে রক্তাক্ত কাটা জখম রয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর সকাল ১০টার দিকে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এরপর তাকে নিয়ে যান স্বজনেরা।

এ বিষয়ে জানতে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও তার স্ত্রীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়।

মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের মেয়ে মুনতাহা আহমদ বলেন, ‘তার বাবার অবস্থা গুরুতর। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজী হননি তিনি। মুক্তিপন প্রদানের বিষয়েও কোন মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

প্রসঙ্গত, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মিসবাহ সিরাজ তিনবার দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি জেলা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর (পিপি) দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্যও ছিলেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ